ম্যাপিং : এই লেকচারের আলোচনার বিষয় Institution of suits and proceedings এবং parties to suit| এই আলোচনার সাথে সরাসরি সম্পর্কিত ধারা ২৬ এবং আদেশ ১, ২, ৩ এবং ৪। কিন্তু এই আলোচনায় ঢোকার আগে কিছু ধারণা ক্লিয়ার হওয়া জরুরি। হয়তো বেশিরভাগই এসব জানেন, তবুও অনেকেই আছেন যারা এই প্রথমবারের মতো হয়তো বিষয়গুলো উপলব্ধি করার জন্য পড়ছেন- তাদের জন্য কাজে লাগতে পারে বেশ।
একটি দেওয়ানি মোকদ্দমা কিভাবে গঠন হয়, কিভাবে দায়ের করতে হয় এবং এর আবশ্যকীয় পক্ষ কারা বা এর আবশ্যকীয় উপাদানগুলো কি কি- এগুলোই উপরোক্ত ধারা ও আদেশে আলোচনা করা আছে। দেওয়ানি কার্যবিধির ১ থেকে ৯ আদেশসমূহ প্রতিটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই আদেশসমূহ বোঝাবুঝির ওপরেই নির্ভর করছে পরের পড়াগুলোতে কীভাবে কত সহজে ঢুকতে পারবেন। এই আদেশগুলো থেকে লিখিত পরীক্ষায় তত্ত্বীয় প্রশ্নও এসে থাকে অনেক।
এই লেকচারের আলোচনায় প্রবেশের আগে অবশ্যই সাপ্লিমেন্টারি বুকের ….. পৃষ্ঠায় থাকা আলোচনাটি বিশেষত প্রথম ৯টি আদেশে কী কী বিষয় বর্ণিত আছে এবং দেওয়ানি কার্যবিধির মূল সূচিপত্র ও দেওয়ানি কার্যবিধির ধারাসমূহ এবং আদেশের ভেতরের সম্পর্ক—সাযুজ্য কী তা বুঝে নিয়ে যাত্রাটি শুরু করা দরকার। কেননা, আমরা এই আলোচনা থেকেই আদেশের আলোচনায় প্রসঙ্গক্রমে ঢুকে পড়ছি। ধারা ও আদেশের সম্পর্কে বেসিকটুকু জেনে নিয়ে এই লেকচারে এগোনো ভালো।
মূল আলোচনা
মোকদ্দমার পক্ষগণ : ১ নং আদেশ
দেওয়ানি মোকদ্দমা [বা ইংরেজিতে Suit ] কাকে বলে তা কোনো সংজ্ঞায় সংজ্ঞায়িত করা নাই এই কার্যবিধিতে। তবে, আমরা সাধারণ জ্ঞান থেকে জানি যে, কোনো ঘটনায় সংক্ষুব্ধ বা বঞ্চিত বা বিক্ষুব্ধ পক্ষ তার প্রতিকার প্রার্থনা করে আদালতে যখন একটি আবেদন করে যেখানে কোনো দায় বা অধিকারের অস্তিত্ব থাকে, তখনই তা দেওয়ানি মোকদ্দমা বলে পরিগণিত হয়। একটি মোকদ্দমার আবশ্যকীয় ৪টি উপাদান থাকে। এই ৪টি উপাদান ঘিরেই দেওয়ানি মামলা দায়ের হয় এবং তা অগ্রসর হয় প্রতিকার দেওয়ার উদ্দেশ্যে।
১. মোকদ্দমার পরস্পর বিরোধী পক্ষ বা পক্ষগণ
২. বিচার্য বিষয়বস্তু যা নিয়ে প্রতিকার দাবি করা হয়
৩. মামলা উদ্ভবের যথাযথ কারণ
৪. প্রার্থিত প্রতিকার
আমাদের আলোচনার প্রধান বিষয় হলো ১ নং বিষয়টি- মোকদ্দমার পরস্পর বিরোধী পক্ষ বা পক্ষগণ বিষয়ে; সাথে মোকদ্দমা দায়ের ও গঠন সম্পর্কে।
মোকদ্দমার দুইটি পক্ষ থাকে- এটিতো জানা কথা। কিন্তু এই পক্ষগুলো নানা ফর্মে বা নানা ধরনে মামলায় হাজির থাকে। অনেক সময় একাধিক বাদী এবং একাধিক বিবাদী থাকতে পারে দেওয়ানি মামলায়। দেওয়ানি মামলায় মামলার পক্ষসমূহ অনেক বিস্তৃত বিবেচনায় যুক্ত হতে পারে। ফলে এটিকে খানিকটা বিশেষভাবে বোঝা দরকার।
ফাঁকতালে একটি কথা বলে নেওয়া ভালো। দেওয়ানি কার্যবিধিতে মাত্র ১৫৮টি ধারা থাকলেও এর ৫১টি আদেশে যতো বিস্তৃত আলোচনা আছে তা উপলব্ধিতে নেবার জন্য কিছু কিছু আদেশ অনেক ডিটেইলে বুঝে নিয়ে সহজ হয়ে যাবে। সব জ্ঞানের বড় জ্ঞান হলো কাণ্ডজ্ঞান! মানে Common Sense! আপনার অনেক জ্ঞান আছে, আপনি বিরাট জ্ঞানী লোক কিন্তু আপনার যদি কমনসেন্স না থাকে তাহলে প্রচলিত সমাজে আপনিতো চলারই যোগ্য নন, তাইনা? জগতে বই বা থিওরি থেকে প্রাপ্ত জ্ঞান সহজে হৃদয়ঙ্গম বা উপলব্ধি করার সহজ কৌশল হলো- এই কমনসেন্স বা কাণ্ডজ্ঞানকে কাজে লাগানো। তো, এই আদেশগুলো পড়ার সময় আপনাকে এই কাণ্ডজ্ঞানকেই সবচেয়ে বেশি কাজে লাগাতে হবে। আদেশগুলোতে টপিক ভিত্তিক বিষয়বস্তু উল্লেখ করাই আছে। আপনার কাজ হলো উক্ত বিষয়বস্তুকে মাথায় রেখে তা একটি দেওয়ানি মামলায় কোন পর্যায়ে কাজে লাগে, কী কী ভিন্ন পরিস্থিতিতে ভিন্ন ভিন্ন ধারা বা আদেশের বিধির প্রয়োজনীয়তা তা কল্পনাশক্তি কাজে লাগিয়ে উপলব্ধির চেষ্টা করা। আমরা একটা অনুরোধ করবো- এই ১ নং আদেশটির আদ্যোপান্ত, প্রতিটি শব্দ বা অক্ষর বোঝার চেষ্টা করবেন মূল বিধিগুলো পড়ে পড়ে। ভালোভাবে বোঝার চেষ্টা করবেন ‘মোকদ্দমার পক্ষগণ’ শিরোনামে কী কী পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করা হয়েছে বা কী কী পরিস্থিতি একটি মামলায় উপস্থিত হতে পারে! এই আদেশটি ভালোভাবে বোঝার চেষ্টা করার মধ্য দিয়ে অন্যান্য আদেশসমূহ পড়ার বিষয়ে ভীতি কেটে যাবে বলে আশা রাখি। উপরন্তু, এই আদেশসমূহ কিন্তু বেশ সহজপাঠ্য এবং মজাদার। প্লিডিংস, আরজি বা জবাব সংক্রান্ত আদেশগুলো পড়লে খুবই সহজ লাগবে। যাই হোক, কিন্তু মনে রাখার ক্ষেত্রে কমনসেন্স কাজে লাগাতে হবে।
‘মোকদ্দমার পক্ষগণ’ শিরোনামে ১ নং আদেশের ১৩টি বিধিতে বিষয়বস্তুটি সম্পর্কে বিধান বর্ণিত আছে। মোকদ্দমার পক্ষ কারা হবে, তারা কিভাবে যুক্ত হতে পারবে, কিভাবে বাদ যাবে, ভুলবশত কেউ পক্ষ হলে তার কি হবে, একাধিক বাদীর পক্ষে প্রতিনিধি আকারে কেউ মোকদ্দমা চালাতে পারবে কি না ইত্যাদি বিষয় এখানে বলা আছে। প্রথম ৩টি বিধি নিজে নিজে পড়ে নিন, দ্যাখেনতো বোঝেন কিনা!
আদেশ ১ : মোকদ্দমার পক্ষগণ [Parties to suits]
১ : যাকে বাদী হিসেবে যুক্ত করা যাবে : যে সকল ব্যক্তিবর্গ একই কার্য বা লেনদেন অথবা এই শ্রেণির কার্যাবলীর বা লেনদেনসমূহের মধ্য হতে বা এদের সম্পর্কে একত্রে, পৃথকভাবে বা বৈকল্পিক ক্রমে কোনো প্রতিকারের অধিকার বিদ্যমান থাকে বলে দাবি করেন, যেক্ষেত্রে এরূপ ব্যক্তিগণ পৃথক পৃথক মামলা দায়ের করলে আইন বা তথ্য সংক্রান্ত একটি সাধারণ প্রশ্নের উদ্ভব হতে পারে, সেরূপ সকল ব্যক্তিকে একই মামলায় বাদী হিসেবে যুক্ত করা যায়। [All persons may be joined in one suit as plaintiffs in whom any right to relief in respect of or arising out of the same act or transaction or series of acts or transactions is alleged to exist, whether jointly, severally or in the alternative, where, if such persons brought separate suits, any common question of law or fact would arise.]
২ : আলাদা বিচার অনুষ্ঠানের আদেশ প্রদানে আদালতের ক্ষমতা : যেক্ষেত্রে আদালতের নিকট ইহা প্রতীয়মান হয় যে বাদীদের একত্রীকরণ মামলার বিচার অনুষ্ঠানে অসুবিধায় ফেলতে বা বিলম্ব ঘটাতে পারে, সেক্ষেত্রে আদালত বাদীগণকে তাদের স্বাধীন ইচ্ছায় রাখতে পারেন বা আলাদা বিচারানুষ্ঠানের আদেশ প্রদান করতে পারেন অথবা এরূপ আদেশ যা সুবিধাজনক মনে হয়, প্রদান করতে পারেন। [Where it appears to the Court that any joinder of plaintiffs may embarrass or delay the trial of the suit, the Court may put the plaintiffs to their election or order separate trials or make such other order as may be expedient.]
৩ : যাদেরকে বিবাদী হিসেবে যুক্ত করা যায় : যেসকল ব্যক্তিবর্গের বিরুদ্ধে একই কার্য বা লেনদেন বা একই শ্রেণির কার্যাবলীর বা লেনদেনসমূহের মধ্য হতে বা এদের সম্পর্কে একত্রে, পৃথকভাবে বা বৈকল্পিক ক্রমে কোনো প্রতিকার লাভের অধিকার বিদ্যমান থাকে বলে নালিশ করা হয়, এবং যেক্ষেত্রে পৃথক মামলা আনয়ন করলে আইন বা তথ্য সম্পর্কে একটি সাধারণ প্রশ্নের উদ্ভব হবে, সেক্ষেত্রে সেই সকল ব্যক্তিগণকে একই মামলায় বিবাদী হিসেবে যুক্ত করা যায়। [All persons may be joined as defendants against whom any right to relief in respect of or arising out of the same act or transaction or series of acts or transactions is alleged to exist, whether jointly, severally or in the alternative, where, if separate suits were brought against such persons, any common question of law or fact would arise.]
বিধি ১ এবং ৩ এ যথাক্রমে বাদী এবং বিবাদীদেরকে যুক্ত করার বিষয়ে বলা আছে। একটা বিষয় সম্ভবত খেয়াল করেছেন- মূল ল্যাংগুয়েজটা কিন্তু একই! বাদী হোক বা বিবাদী হোক একটি মামলায় যুক্ত হবার ক্ষেত্রে যে শর্ত বা রিকোয়ারমেন্ট বলা আছে তার মূল সুর হচ্ছে- একই আইন বা তথ্যগত প্রশ্নের উদ্ভব হতে পারে [any common question of law or fact would arise] এমন ক্ষেত্রে এবং একই প্রতিকার চাওয়া হচ্ছে এমন ক্ষেত্রে- এই দুইটি ক্ষেত্রে বাদী বা বিবাদী একটি মামলায় যুক্ত হতে পারে। যখন একের অধিক বাদী বা বিবাদীর প্রয়োজন যুক্তিসঙ্গত আকারে থাকে তখনই এই বিধি ২টি প্রয়োগ করে এর সমাধান করা যায়।
কেন এই যুক্ত করার প্রশ্ন আসে? এর সবচে ব্যবহারিক উত্তর হচ্ছে- একই বিষয় বিচারের জন্য আদালতের সময় বাঁচানো বা একাধিক মামলা হওয়া রোধ করা।
আবার আদালতের বিবেচনায় যদি মনে হয় যে, বাদীগণকে একত্রিত করে বিচার করা নানা দিক থেকে নানা কারণে অসুবিধাজনক তবে আদালত তার স্বীয় বিবেচনায় আলাদাভাবে বিচার অনুষ্ঠিত করার আদেশও দিতে পারেন- এটিই ২ নং বিধির মূল কথা। এটি মূলত আদলতকে তার স্বীয় বিবেচনায় সুবিধাজনক সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতা প্রদান করেছে। এই বিধিবলে আদালত তার সুবিবেচনা প্রয়োগ করে বাদীগণের যুুক্ত হওয়া বা না হওয়া বিষয়ে আদেশ দিতে পারেন।
ওপরের মতো করে প্রতিটি বিধিই মনোযোগ দিয়ে পড়ে ফেলতে পারেন। কমনসেন্স প্রয়োগ আবশ্যক। যেমন, একাধিক বাদী থাকতে পারে একটি মোকদ্দমায়। কিন্তু সকলেই ঠিক একই ধরনের প্রতিকার পাবেন এমন নয়। আবার, একাধিক বিবাদীর ভেতর সকলেই দায়ী বা দায়গ্রস্থ সাব্যস্ত নাও হতে পারেন। সেক্ষেত্রে আদালত বাদীদের ক্ষেত্রে ভিন্ন প্রতিকার যেমন দিতে পারেন, তেমনি বিবাদীদের জন্যও ভিন্ন ভিন্ন প্রতিকূল রায় হতে পারে। মানে যেমনটা প্রযোজ্য হয় যার প্রতি, তেমনিভাবে আদালত তার রায় প্রয়োজনানুসারে দিতে পারে। এটিই ৪ নং বিধির মূল কথা। আবার ৭ বিধিতে বলা আছে কোনো বিবাদীর দায় কতটুকু বা আদৌ তার কোনো দায় আছে কিনা সেটি সম্পর্কে বাদী সন্দিহান হইলেও তাকে বিবাদী হিসেবে যুক্ত করে আদালতের বিচারের প্রক্রিয়ায় তার দায় নির্ধারণ করা যেতে পারে। বাকি সব বিধিগুলো নিজেরাই একে একে দেখে নিনতো একবার! ৮, ৯ ও ১০ নং বিধি খুবই ডিটেইলে মনে রাখতে হবে; গুরুত্ব দিয়ে পড়তে অনুরোধ থাকবে।
৪ : আদালত এক বা একাধিক যুগ্ম পক্ষের অনুকূলে বা প্রতিকূলে রায় দিতে পারেন : কোনো সংশোধন ব্যতিরেকেই—
ক) এরূপ এক বা একাধিক বাদীগণের মধ্যে যাদেরকে প্রতিকার লাভের অধিকারী হিসেবে সাব্যস্ত করা হয়, তাকে বা তাদেরকে সেরূপ প্রতিকার লাভের অধিকারী করার জন্য;
খ) এরূপ এক বা একাধিক বিবাদীর মধ্যে যে বা যারা সাব্যস্ত হয়, তাদের বিরুদ্ধে স্ব স্ব দায়—দায়িত্বের অনুপাতে রায় দেওয়া যাবে।
৫ : দাবিকৃত সকল প্রতিকার সম্পর্কে প্রত্যেক বিবাদীর স্বার্থ সংশ্লিষ্ট হওয়ার দরকার নাই : কোনো মামলায় প্রত্যেক বিবাদীর দাবিকৃত সকল প্রতিকার সম্পর্কে স্বার্থ সংশ্লিষ্ট হওয়ার কোনো প্রয়োজন নাই।
৬ : একই চুক্তি প্রসঙ্গে দায়ী পক্ষগণের একত্রীকরণ : বাদী তাদের ইচ্ছানুসারে বরাত চিঠি [Bill of exchange] , হুন্ডি [Hundi] ও অঙ্গীকারপত্র [Promissory] সহ কোনো একটি চুক্তি পৃথকভাবে বা যৌথ ও পৃথকভাবে দায়ী সকল ব্যক্তিকে একই মামলায় পক্ষ হিসেবে যুক্ত করতে পারে।
৭ : কার বিরুদ্ধে প্রতিকার চাইতে হবে, সেই সম্পর্কে বাদী সন্দিহান হলে : কার নিকট হতে প্রতিকার লাভের অধিকারী সেই সম্পর্কে বাদীর সন্দেহ থাকলে, কোনো বিবাদী দায়ী এবং কি পরিমাণে দায়ী সেই সম্পর্কিত প্রশ্নটি সকল পক্ষের মধ্যে নির্ধারণ করার জন্য সে দুই বা ততোধিক বিবাদীকে যুক্ত করতে পারে।
৮ : একই ব্যক্তি একই স্বার্থ সংশ্লিষ্ট সকলের পক্ষে মামলা করতে বা আত্মপক্ষ সমর্থন করতে পারে : ১) যেক্ষেত্রে কোনো মামলায় বহু সংখ্যক লোকের একই রূপ স্বার্থ নিহিত থাকে, সেক্ষেত্রে আদালতের অনুমতিক্রমে এরূপ এক বা একাধিক ব্যক্তি স্বার্থ সংশ্লিষ্ট সকল ব্যক্তির পক্ষে বা উপকারার্থে এরূপ মামলা করতে বা মামলায় বিবাদী হতে বা অভিযোগের জবাব দিতে পারে। কিন্তু এরূপ ক্ষেত্রে আদালত বাদীর খরচে অনুরূপ স্বার্থ সংশ্লিষ্ট সকলকে মামলা দায়ের সম্পর্কে ব্যক্তিগত জারির মাধ্যমে নোটিশ প্রদান করবেন, যেক্ষেত্রে লোকের সংখ্যাধিক্যের বা অন্য কোনো কারণে এরূপ নোটিশ জারি যুক্তিসঙ্গতভাবে উপযোগী না হয়, গণ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে, প্রত্যেক ক্ষেত্রে আদালত সেভাবেই নির্দেশ দেবেন।
২) উপবিধি (১) অনুসারে যেকোনো ব্যক্তি যাদের পক্ষে বা উপকারার্থে কোনো মামলা দায়ের করা হয়েছে বা অভিযোগের জবাব দেওয়া হয়েছে, এরূপ মামলায় পক্ষ হওয়ার জন্য আদালতে আবেদন করতে পারে।
৯ : অপসংযোগ ও অসংযোগ [Misjoinder and nonjoinder] : বেআইনিভাবে কোনো পক্ষকে সংযোজন করা অথবা সংযোজন না করার কারণে কোনো মামলা ব্যর্থ হবে না, এবং আদালত ইহার সামনে আনীত প্রত্যেকটি মামলায় বিরোধীয় বিষয়টি পক্ষগণের অধিকার ও স্বার্থসমূহের সঙ্গে যতটুকু সম্পর্কিত ততটুকু বিবেচনা করতে পারেন [No suit shall be defeated by reason of the misjoinder or nonjoinder of parties, and the Court may in every suit deal with the matter in controversy so far as regards the rights and interests of the parties actually before it.]|
১০ : ভুল বাদীর নামে মামলা [Suit in name of wrong plaintiff] : ১) যেক্ষেত্রে ভুল ব্যক্তিকে বাদী করে মামলা দায়ের করা হয়েছে, অথবা সঠিক ব্যক্তিকে বাদী হিসেবে মামলা দায়ের করা হয়েছে কিনা সেই বিষয়ে সন্দেহ রয়েছে, সেক্ষেত্রে মামলার যেকোনো পর্যায়ে আদালত যদি মনে করেন যে, মামলা দায়ের করতে সদুদ্দেশ্যমূলক ভুল করা হয়েছে, এবং বিরোধীয় প্রকৃত বিষয়টি নির্ধারণের জন্য অন্য কোনো ব্যক্তিকে বাদী হিসেবে প্রতিস্থাপন বা সংযোজন করা আবশ্যক, সেক্ষেত্রে আদালত যেমন সঙ্গত মনে করেন, তেমন শর্তে সেরূপ আদেশ দান করতে পারেন।
২) আদালত পক্ষসমূহকে বাদ দিতে বা যোগ করতে পারেন : মামলার যেকোনো পর্যায়ে আদালত যেকোনো পক্ষের আবেদনক্রমে বা বিনা আবেদনে এবং সেই সকল শর্তে যা আদালতের কাছে সঙ্গত বলে প্রতীয়মান হয়, অন্যায়ভাবে যুক্ত কোনো পক্ষের নাম, বাদী বা বিবাদী যে হিসেবেই হোক, কর্তন করতে এবং অন্য যে ব্যক্তির নাম বাদী বা বিবাদী যে হিসেবেই হোক যুক্ত করা উচিত অথবা মামলায় বিজড়িত প্রশ্নসমূহের কার্য ও সম্পূর্ণভাবে বিচার ও নিষ্পত্তি করার জন্য আদালতের সামনে যার উপস্থিতি প্রয়োজন হতে পারে, তাকে যুক্ত করতে আদেশ দিতে পারেন।
৩) কোনো ব্যক্তিকেই বাদী হিসেবে মামলার জন্য নেক্সট ফ্রেন্ড ব্যতীত বা অক্ষম কোনো বাদীর নেক্সট ফ্রেন্ড হিসেবে তার সম্মতি ছাড়া যোগ করা যাবে না।
৪) বিবাদীর নাম যুক্ত করলে আরজি সংশোধন করতে হবে [Where defendant added, plaint to be amended] : যেক্ষেত্রে মামলায় কোনো নতুন বিবাদীকে যুক্ত করা হয়, সেক্ষেত্রে আদালত অন্য কোনো রূপ নির্দেশ প্রদান না করলে, আরজি প্রয়োজন মোতাবেক সংশোধন করতে হবে এবং সংশোধিত আরজি ও সমনের নকল নতুন বিবাদীর উপর জারি করতে হবে এবং আদালত উপযুক্ত মনে করলে মূল বিবাদীর উপরও জারি করতে হবে।
৫) ১৯০৮ সালের তামাদি আইনের ২২ ধারার বিধান সাপেক্ষে যে ব্যক্তিকে বিবাদী হিসেবে সংযুক্ত করা হয়েছে, তার বিরুদ্ধে সমন প্রাপ্তির তারিখ হতে আইনগত কার্যক্রম শুরু হয়েছে বলে গণ্য করতে হবে।
১১ : মামলা পরিচালনা [Conduct of suit] : আদালত যাকে উপযুক্ত মনে করেন, তাকেই মামলা পরিচালনা করার দায়িত্ব দিবেন।
১২ : কতিপয় বাদী বা বিবাদীর মধ্যে একজনের উপস্থিতি [Appearance of one of several plaintiffs or defendants for others] : ১) কোনো মামলায় যেক্ষেত্রে একাধিক বাদী থাকেন, তাদের যেকোনো একজন বা একাধিক জনকে তাদের অন্যরা তাদের পক্ষে আদালতে হাজির হয়ে কথা বলার জন্য বা কাজ করার জন্য ক্ষমতা প্রদান করতে পারবে।
২) ক্ষমতা প্রদানকারীর পক্ষে দস্তখত দিয়ে লিখিতভাবে ক্ষমতা দিবেন এবং ইহা আদালতে দাখিল প্রদান করবেন।
১৩ : অপসংযোগ বা অসংযোগ সম্পর্কে আপত্তি [Objections as to nonjoinder or misjoinder] : কোনো মামলায় পক্ষের অপসংযোগ সম্পর্কে সকল আপত্তি শীঘ্রতম সম্ভাব্য সুযোগের মধ্যে করতে হবে এবং যে সময় বা তৎপূর্বে, যদি না আপত্তির কারণ পরবর্তীতে উদ্ভব হয় এবং অনুরূপ যেকোনো আপত্তি এরূপ যথাসময়ে উত্থাপন না করলে তা পরিত্যাগ করা হয়েছে বলে গণ্য হবে।
বাংলায় অপসংযোগ বা পক্ষসমূহের অপসংযোগ যেটাকে ইংরেজিতে বলে Mis-joinder of PartiesÑ যার মানে হলো ভুুলক্রমে কাউকে একটি মামলার পক্ষভুক্ত করা; অপরদিকে, বাংলায় অসংযোগ বা পক্ষসমূহের অসংযোগ যেটাকে ইংরেজিতে বলে Non-joinder of PartiesÑ যার মানে হলো কাউকে পক্ষভুক্ত করার প্রয়োজন ছিলো কিন্তু পক্ষভুক্ত করা হয় নিÑ এই দুইটি ধারণা ভালোভাবে মনে রাখুন। বিধি ৯ এবং ১০ এই দুইটি বিধিতে এ সম্পর্কে বলা আছে। ১০ বিধির ১—৩ নং বিধিতে কোনো বাদীর নাম যুক্ত করা সম্পর্কে বলা আছে এবং অন্যদিকে, ১০ বিধির ৪ ও ৫ উপবিধিতে বলা আছে বিবাদীর নাম যুক্ত করতে হলে আরজি সংশোধন করতে হবে এবং তামাদি আইনের ২২ ধারার বিধানসাপেক্ষে নতুন বিবাদী যেদিন সমন প্রাপ্ত হবেন সেদিন থেকেই তার বিরুদ্ধে আইনগত কার্যক্রম শুরু হয়েছে বলে ধরে নিতে হবে। ১২ বিধিতে বলা আছে কিভাবে একাধিক বাদীর পক্ষে একজন মামলা প্রতিনিধিত্বমূলক আকারে পরিচালনা করবেন। সেক্ষেত্রে লিখিতভাবে এই ক্ষমতা প্রদান করার ডকুমেন্টটি আদালতে জমা দিতে হবে। ৮ বিধিটিও এর সাথে সম্পর্কিত। ৮ বিধিটি থেকে পরীক্ষায় প্রশ্ন এসে থাকে। এটি প্রতিনিধিত্বমূলক বাদী বা বিবাদী কতৃর্ক মোকদ্দমা পরিচালনা বিষয়ক।
মোকদ্দমা দায়েরের স্থান তথা আদালতের এখতিয়ার নিয়ে আপত্তি যেমন করার সুযোগ সম্পর্কে আমরা ইতিমধ্যে দেখে এসেছি [২১ অথবা ২২ ও ২৩ ধারায়]; তেমনি মোকদ্দমায় যুক্ত পক্ষগণ সম্পর্কেও আপত্তি তোলার সুযোগ আছে ১ নং আদেশের ১৩ বিধি অনুসারে। এটিও ভোলা যাবে না। এমসিকিউ বা লিখিত পরীক্ষায় এখান থেকেও প্রশ্ন আসতে পারেন।
১ নং আদেশের ১৩ টি বিধি নিয়ে এটুকুই আলোচনা। ২ ও ৩ নং আদেশ এবার।
মোকদ্দমার গঠন : ২ নং আদেশ
২ নং আদেশটির শিরোনাম – মোকদ্দমা গঠন। এই শিরোনামে এই আদেশটিতে মূলত কোনো মোকদ্দমার গঠন বিন্যাস কেমন হওয়া উচিত, বিশেষত এর করে সারবস্তু কেমন হবে বা কীভাবে কোনো প্রতিকার বা দাবি তুলতে হবে, সে বিষয়ে দিকনির্দেশনা দিয়েছে। এই আদেশটি দেওয়ানি মোকদ্দমা সংক্রান্তে খুবই মৌলিক একটি আদেশ। এই আদেশের ১ নং বিধিতে লক্ষ্য করবেন যে, অতিরিক্ত মোকদ্দমা নিবারণ করার লক্ষ্যে এমনভাবে মোকদ্দমা দায়ের করতে হবে যেন, বিরোধীয় বিষয় নিয়ে চূড়ান্তভাবে সিদ্ধান্ত দিতে পারে আদালত। একই বিষয়বস্তু নিয়ে একবার একটি প্রতিকার দাবি করা হলো কিন্তু সেখানে ক্ষতিপূরণ চাওয়া হলো না, যদিও উক্ত মোকদ্দমায় ক্ষতিপূরণসমেত প্রতিকার পাওয়া সম্ভব ছিলো -এমনটি যেন না হয়। এমনটি হলে দেখা যাবে ক্ষতিপূরণের মোকদ্দমা পরে আলাদাভাবে করার প্রয়োজন অনুভূত হচ্ছে। কিন্তু, রেস জুডিকাটার বিধান অনুসারে বা ১১ ধারার ৪ উপধারা মতে অথবা অন্যান্য বিভিন্ন স্থানেও এরূপ বিধিনিষেধ আছে যে, একই বিরোধীয় বিষয় নিয়ে পরবর্তীতে অন্য একটি প্রতিকার যা কিনা পূর্বের মোকদ্দমাতেই চাওয়া যেতো – সেরূপভাবে কোনো মোকদ্দমা পরে আর করা যাবে না বা বারিত বা নিষিদ্ধ। সেদিক থেকে ২ নং আদেশের ১ নং বিধিটি তাৎপর্যপূর্ণ খুবই।
২ নং আদেশের অন্যান্য বিধিও ১ নং বিধিটিরই আরো বিস্তারিত এবং সুনির্দিষ্ট বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বিধান বর্ণনা করেছে, যা কিনা মূলত ১ নং বিধিটিরই বক্তব্যকে শক্তিশালী করেছে। ২, ৩ ৬ ও ৭ নং বিধিসমূহ বিশেষ মনোযোগের দাবি রাখে এই আদেশ থেকে। পড়ে ফেলুন।
আদেশ ০২ : মোকদ্দমা গঠন [Frame of Suit]
১ : মোকদ্দমা গঠন : প্রত্যেক মামলা এমন কার্যকরভাবে গঠন করতে হবে যাতে বিরোধীয় বিষয়টির উপর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য সঙ্গত কারণ প্রদান করতে পারে এবং সেই বিষয় সম্পর্কে অতিরিক্ত মামলা নিবারণ করতে পারে। [Every suit shall as far as practicable be framed so as to afford ground for final decision upon the subjects in dispute and to prevent further litigation concerning them.]
২ : মামলায় সমগ্র দাবি অন্তর্ভুক্ত থাকবে : ১) মামলার কারণ সম্পর্কে বাদী যে পরিমাণ দাবি করার অধিকারী, প্রত্যেক মামলায় সেই সবটুকু অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। কিন্তু কোনো বাদী মামলাটি কোনো আদালতের এখতিয়ারে আনার জন্য তার দাবির আংশিক বর্জন করতে পারে।
২) দাবির আংশিক পরিত্যাগ বাদী যদি তার দাবির কোন অংশ বাদ দিয়ে মামলা করে বা ইচ্ছাকৃতভাবে ছেড়ে দেয়, তৎপরবর্তীতে সেই বর্জিত বা পরিত্যক্ত দাবির অংশ সম্পর্কে মামলা করতে পারবে না।
৩) কোনো ক্ষেত্রে বাদী মামলার একই বিষয়বস্তু সম্পর্কে একাধিক প্রতিকার দাবি করার অধিকারী হলে সে সমস্ত বা তন্মধ্যে যেকোনো প্রতিকার দাবি করে মামলা করতে পারবে। তবে আদালতের অনুমতি ব্যতীত উক্তরূপ প্রতিকারগুলির মধ্যে কোনটি দাবি না করে থাকলে পরে সেরূপ কোনো প্রতিকার দাবি করা চলবে না।
ব্যাখ্যা : অত্র বিধির উদ্দেশ্যে কোনো দায় বা উহা পরিশোধের জন্য প্রদত্ত আনুষঙ্গিক জামানত এবং উক্ত দায় সংক্রান্ত কোনো পরবর্তী দাবি একই বিষয়বস্তু বলে গণ্য হবে।
উদাহরণ : আহাদ বার্ষিক ১২০০ টাকা ভাড়ায় বীরেনকে একটি বাড়ি ভাড়া দেয়। ১৯০৫, ১৯০৬ এবং ১৯০৭ সালে সম্পূর্ণ ভাড়া বাকি পড়ে। ১৯০৮ সালে আহাদ কেবলমাত্র ১৯০৬ সালে ভাড়ার দাবিতে বীরেনের বিরুদ্ধে মামলা করে। ১৯০৫ ও ১৯০৭ সালের ভাড়ার জন্য আহাদ পরে আর বীরেনের বিরুদ্ধে মামলা করতে পারবে না।
৩ : মামলার কারণ একত্রীকরণ [Joinder of causes of action] : ১) অন্যত্র যেরূপ বিধান আছে, তা ব্যতীত বাদী একই মামলায় একই বিবাদী বা একইরূপ যৌথ বিবাদীগণের বিরুদ্ধে মামলার কতিপয় কারণ একত্রিত করতে পারে এবং কতিপয় বাদী একই বিবাদী বা একইরূপ যৌথ বিবাদীগণের বিরুদ্ধে মামলার কারণের সাথে যৌথভাবে স্বার্থ সংশ্লিষ্ট হলে একই মামলায় মামলার কারণসমূহ একত্রিত করতে পারে।
২) যেক্ষেত্রে কোনো মামলায় কতিপয় কারণ একত্রিত করা হয়, সেক্ষেত্রে মামলা দায়েরের তারিখে মামলার মোট বিষয়বস্তুর পরিমাণ বা মূল্যের উপর আদালতের এখতিয়ার নির্ভর করবে।
৪ : স্থাবর সম্পত্তি উদ্ধারের জন্য কেবলমাত্র কয়েকটি দাবি যোগ করা যাবে : স্থাবর সম্পত্তি উদ্ধারের কোনো মামলায় আদালতের অনুমতি যদি না থাকে, তবে নিম্নোক্তগুলি ব্যতীত মামলার কোনো কারণ যোগ করা যাবে না—
ক) দাবিকৃত সম্পত্তি বা ইহার অংশ সম্পর্কে কোনো অন্তবর্তীকালীন মুনাফা বা বকেয়া খাজনার দাবি;
খ) যে চুক্তির অধীনে কোনো সম্পত্তি বা ইহার কোনো অংশ দখল করা হয়, সেই চুক্তি ভঙ্গের জন্য ক্ষতিপূরণের দাবি;
গ) মামলার একই কারণের উপর নির্ভরশীল প্রতিকার সংক্রান্ত দাবি;
তবে শর্ত থাকে যে, বন্ধকী সম্পত্তি খালাসের অধিকার হরণ বা বন্ধকী সম্পত্তি মুক্তির মামলার কোনো পক্ষ বন্ধকী সম্পত্তির দখল চাইলে অত্র বিধি তা বাধা প্রদান করবে বলে গণ্য করা যাবে না।
৫ : নির্বাহক, প্রশাসক বা উত্তরাধিকারীদের দ্বারা বা তাদের বিরুদ্ধে দাবি : কেউ কোনো সম্পত্তির নির্বাহক, প্রশাসক বা উত্তরাধিকারী হিসেবে মামলা করলে বা তার বিরুদ্ধে মামলা করা হলে সেই মামলার কোনো দাবি ব্যক্তিগতভাবে উক্ত ব্যক্তি কর্তৃক বা তার বিরুদ্ধে মামলার কোনো জারির সাথে একত্রিত করা যাবে না; যদি না যে সম্পত্তি সম্পর্কে বাদী নির্বাহক, প্রশাসক বা উত্তরাধিকারী হিসেবে মামলা করে বা বিবাদীর বিরুদ্ধে সেই হিসেবে মামলা করা হয়, শেষোক্ত দাবি সেই সম্পত্তি হতে উদ্ভব হলে অথবা সে মৃত ব্যক্তির সাথে যৌথভাবে যা সে প্রতিনিধিত্ব করে, তাতে অধিকারী বা দায়ী হয়।
৬ : পৃথক বিচারের আদেশ দানে আদালতের ক্ষমতা [Power of Court to order separate trials] : যদি আদালতের কাছে ইহা প্রতীয়মান হয় যে, কোনো মামলার একত্রীকৃত কারণসমূহ সুবিধাজনকভাবে একত্রে বিচার বা নিষ্পত্তি করা সম্ভব নয়, তাহলে আদালত পৃথক বিচারের আদেশ প্রদান বা সুবিধাজনক অন্য কোনরূপ আদেশ প্রদান করতে পারেন।
৭ : মামলার কারণের অপসংযোগ সংক্রান্ত আপত্তি [Objections as to misjoinder] : মামলার শীঘ্রতম সম্ভাব্য সুযোগের মধ্যে করতে হবে এবং যে সকল ক্ষেত্রে বিচার্য বিষয় নির্ধারণ করা হয়, সেই সকল ক্ষেত্রে বিচার্য বিষয় নির্ধারণের সময় বা তৎপূর্বে যদি না আপত্তির কারণ পরবর্তীতে উদ্ভব হয়, এরূপ আপত্তি অনুরূপভাবে উত্থাপন না করলে বাদ দেওয়া হয়েছে বলে গণ্য করা হবে।
মোকদ্দমা পরিচালনা সংক্রান্ত : ৩ নং আদেশ
এবার আদেশ নং ৩। এই আদেশের ১ নং বিধির বক্তব্য অনুসারে আদালতে বিভিন্ন কাজ, দরখাস্ত প্রদান বা পদক্ষেপ নেবার ক্ষেত্রে কোনো পক্ষ –
১. ব্যক্তিগতভাবে [by the party in person]
২. স্বীকৃত প্রতিনিধি কর্তৃক [by his recognized agent]
৩. উকিল কর্তৃক [by a pleader]
– এই তিনভাবে বা তিন উপায়ে আদালতে কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে। ১ নং বিধিতে বর্ণিত উপরোক্ত কথাগুলোই এই আদেশের মূল কথা। এরই আরো বিস্তারিত বিধান অন্যান্য বিধিতে বর্ণিত আছে। ৪ নং বিধিটির কথা বিশেষভাবে বিবেচনায় রাখতে হবে। একটি দেওয়ানি মোকদ্দমায় যে একজন উকিল কোনো পক্ষের হয়ে কথা বলেন – সেটি যে এই আদেশের ৪ নং বিধির বিষয় তা মনে রাখা ভবিষ্যত উকিল হিসেবে জরুরি বটে। আদেশটির বিস্তারিত পড়ে রাখুন।
আদেশ ০৩ : স্বীকৃত প্রতিনিধি এবং উকিলবৃন্দ [Recognized Agents and Pleaders]
১ : হাজিরা, ইত্যাদি ব্যক্তিগতভাবে, স্বীকৃত প্রতিনিধির মাধ্যমে বা উকিলের মাধ্যমে হতে পারে : কোনো আদালতে হাজিরা দেওয়া, আবেদন করা বা কোনো কাজ আইনত বা আইনে প্রদত্ত ক্ষমতাবলে, এরূপ কোনো আদালতে কোনো পক্ষের করতে হলে, যেক্ষেত্রে প্রকাশ্যভাবে বর্তমানে বলবৎ কোনো আইনে অন্যরূপ বিধান আছে তা ব্যতিরেকে, সংশ্লিষ্ট পক্ষ ব্যক্তিগতভাবে সম্পন্ন করতে পারে বা তার তরফ হতে তার স্বীকৃত প্রতিনিধি বা উকিল হাজির হতে, আবেদন করতে বা কাজ করতে পারে। [Any appearance, application or act in or to any Court, required or authorized by law to be made or done by a party in such Court, may, except where otherwise expressly provided by any law for the time being in force, be made or done by the party in person, or by his recognized agent, or by a pleader appearing, applying or acting, as the case may be, on his behalf: Provided that any such appearance shall, if the Court so directs, be made by the party in person.]
তবে শর্ত থাকে যে, আদালত যদি নির্দেশ দেন, তবে এরূপ হাজিরা পক্ষকে ব্যক্তিগতভাবে প্রদান করতে হবে।
২ : স্বীকৃত প্রতিনিধি : পক্ষগণের তরফ হতে যে সকল স্বীকৃত প্রতিনিধি এরূপ হাজিরা দিতে, আবেদন করতে এবং কাজ করতে পারেন, তারা হলেন—
ক) পক্ষগণের তরফ হতে হাজিরা দেওয়া, আবেদনপত্র দাখিল করা এবং কার্য সম্পন্ন করার জন্য আম—মোক্তারনামা [Power of attorney],
খ) সংশ্লিষ্ট আদালতের এলাকাধীন বসবাস করে না— এরূপ কোনো পক্ষের তরফ হতে এবং তার নামে হাজিরা দেওয়া, আবেদনপত্র দাখিল করা, এবং কার্য সম্পাদনের জন্য ক্ষমতাপ্রাপ্ত অপর কোনো প্রতিনিধি না থাকলে, যে ব্যক্তি সংশ্লিষ্ট পক্ষের ব্যবসা বা বাণিজ্য পরিচালনা করে, কেবল এরূপ ব্যবসা সংক্রান্ত মামলায় সেই ব্যক্তি।
৩ : স্বীকৃত প্রতিনিধির উপর পরোয়ানা জারি : ১) আদালত অন্য কোনরূপ নির্দেশ না দিলে, পক্ষের স্বীকৃত প্রতিনিধির উপর পরোয়ানা জারি করা হলে তা পক্ষের উপর ব্যক্তিগতভাবে জারি করার ন্যায়ই কার্যকর হবে।
২) কোনো মোকদ্দমায় পক্ষের উপর পরোয়ানা জারি করার বিধানসমূহ স্বীকৃত পক্ষের উপর পরোয়ানা জারি করার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে।
৪ : উকিল নিয়োগ : ১) কোনো ব্যক্তি কর্তৃক বা আম—মোক্তারনামা অনুসারে ক্ষমতাপ্রাপ্ত অথবা স্বীকৃত প্রতিনিধি কর্তৃক লিখিত ও স্বাক্ষরিত নিয়োগপত্র দ্বারা নিযুক্ত না হলে কোনো উকিল উক্ত ব্যক্তির তরফ হতে কোন কার্য সম্পন্ন করতে পারবে না।
২) এরূপ প্রত্যেক নিয়োগপত্র আদালতে দাখিল করতে হবে এবং যতক্ষণ পর্যন্ত আদালতের অনুমতিক্রমে মক্কেল বা উকিল কর্তৃক লিখিত ও স্বাক্ষরিত পত্র আদালতে দাখিল করে উক্ত নিয়োগ বাতিল করা না হয়, অথবা যতক্ষণ পর্যন্ত মক্কেল বা উকিলের মৃত্যু না হয়, অথবা যতক্ষণ পর্যন্ত আদালতে মক্কেলের মামলার কার্য শেষ না হয়, ততক্ষণ উক্ত নিয়োগ বলবৎ থাকবে।
৩) উপবিধি (২) এর উদ্দেশ্যে রায় পুনর্বিবেচনার আবেদনপত্র, ১৪৪ বা ১৫২ ধারা অনুসারে আবেদনপত্র কোনো মামলার ডিক্রি বা আদেশ হতে আপিল এবং কোনো দলিলের নকল নেয়ার বা দাখিলকৃত দলিল ফেরত দেয়ার বা মোকদ্দমা প্রসঙ্গে আদালতে জমা দেওয়া টাকা ফেরত নেয়ার আবেদনপত্র সংশ্লিষ্ট মামলার কার্যক্রম বলে গণ্য হবে।
৪) হাইকোর্ট বিভাগ সাধারণ আদেশের মাধ্যমে এরূপ নির্দেশ দিতে পারেন যে, যেক্ষেত্রে উকিল নিয়োগকারী কোনো ব্যক্তি তার নাম লিখতে অসমর্থ, সেক্ষেত্রে উকিল নিযুক্তির জন্য দলিল প্রদত্ত তার চিহ্ন উক্ত আদেশে নির্দিষ্ট রীতিকে এবং অনুরূপ নির্দিষ্ট ব্যক্তি কর্তৃক সত্যায়িত হতে হবে।
৫) কোনো উকিল কেবলমাত্র কোনো পক্ষের সওয়াল বা জবাবের জন্য নিযুক্ত হলে কোনো পক্ষের তরফে সওয়াল করতে বা জবাব দিতে পারবেন না, যদি না তিনি তার নিজের স্বাক্ষরিত এবং—
ক) মামলার পক্ষগণের নাম;
খ) যে পক্ষে তিনি হাজির হবেন, সেই পক্ষের নাম; এবং
গ) যে ব্যক্তি কর্তৃক তিনি হাজিরার ক্ষমতাপ্রাপ্ত হয়েছেন, তার নাম সম্বলিত একটি হাজিরার স্মারকলিপি [memorandum] আদালতে দাখিল করেন।
তবে শর্ত থাকে যে, কোনো পক্ষের তরফ হতে কার্য সম্পাদনের জন্য যথাযথভাবে নিযুক্ত কোনো উকিল যদি সেই পক্ষের তরফ হতে সওয়াল জবাবের জন্য অপর কোনো উকিল নিযুক্ত করেন, তবে এই উপবিধির কোনো কিছুই উক্ত উকিলের বেলায় প্রযোজ্য হবে না।
৫ : উকিলের উপর পরোয়ানা জারি : কোনো পরোয়ানা যদি কোনো পক্ষের উকিলের উপর জারি করা হয় বা উকিলের দফতরে বা বাসগৃহে প্রদান করা হয় এবং তা পক্ষের ব্যক্তিগত হাজিরার জন্য হোক বা না হোক, উহা যথারীতি প্রদান করা হয়েছে এবং যে পক্ষের তিনি প্রতিনিধিত্ব করেন, সেই পক্ষকে জানানো হয়েছে বলে ধরে নেওয়া হবে এবং যদি না আদালত অন্য কোনরূপ নির্দেশ দেন, তবে উহা সংশ্লিষ্ট পক্ষের উপর ব্যক্তিগতভাবে জারি করার ন্যায়ই কার্যকর হবে।
৬ : প্রতিনিধি জারি গ্রহণ করবে : ১) দ্বিতীয় উপবিধিতে বর্ণিত স্বীকৃত প্রতিনিধি ছাড়াও আদালতের এখতিয়ারভুক্ত এলাকায় বাস করে, এমন কোনো ব্যক্তি পরোয়ানা গ্রহণের উদ্দেশ্যে প্রতিনিধি নিযুক্ত হতে পারে।
২) নিযুক্ত লিখিত আকারে হবে এবং আদালতে দাখিল করতে হবে। এরূপ নিযুক্তি বিশেষ অথবা সাধারণ হতে পারে এবং তা মুখ্য ব্যক্তি কর্তৃক স্বাক্ষরিত লিখিত নিয়োগপত্রে হতে হবে এবং উক্ত নিয়োগপত্র বা নিযুক্তি যদি সাধারণ হয়, তবে ইহার একটি সত্যায়িত নকল আদালতে দাখিল করতে হবে।
মোকদ্দমা দায়ের সংক্রান্ত : ২৬ ধারা ও ৪ আদেশ
এবারে, ৪ নং আদেশ। কিন্তু, এই ৪ নং আদেশটি মূলত ২৬ ধারার সাথে সরাসরি সম্পর্কিত একটি আদেশ। আগে ছোট্ট ২৬ নং ধারাটি দেখি।
ধারা ২৬ : মোকদ্দমা দায়ের [Institution of suits] : প্রত্যেকটি মোকদ্দমা আরজি পেশ করে বা নির্ধারিত অন্য কোন পদ্ধতিতে দায়ের করতে হবে [Every suit shall be instituted by the presentation of a plaint or in such other manner as may be prescribed]|
খুব সহজ কথা! দেওয়ানি মোকদ্দমা দায়ের করতে হয় –
১. আরজি দাখিলের মাধ্যমে। অথবা
২. নির্ধারিত অন্য কোনো পদ্ধতিতে।
একদা পরীক্ষায় এ নিয়েও প্রশ্ন এসেছিলো যে, মোকদ্দমা দাখিল করতে হয় কিসের মাধ্যমে? প্রশ্নটি সহজ। কিন্তু, যেকোনো নতুন শিক্ষার্থীর কাছেই এই বেসিক কথাটি জানতে তো হবে, তাই না? ফলে, পুরোনো বা বিগত সালের প্রশ্ন দেখে হাসবেন না; পরে কেউ আপনার ব্যর্থতায় কেউ এমন হাসি আপনাকে ফেরত দেবে।
আচ্ছা, আরজির মাধ্যমে না হয় দেওয়ানি মোকদ্দমা দায়ের করতে হবে। কিন্তু, আরজি কাকে বলে? পেট খারাপ হওয়ায় বিগত ৩ দিন স্কুলে আসতে না পারায় আপনার অনুপস্থিতি সংক্রান্তে স্কুলে যেমন দরখাস্ত দিয়েছেন, তেমন কোনো দরখাস্ত তো নয়, তাই না? তাহলে সারাজীবন যা যা দরখাস্ত লিখে এলেন সেসব থেকে আরজি পৃথক কোন অর্থে, বা আদালতে কোনো দরখাস্ত কীভাবে দাখিল করতে হয় কিংবা সেইসব আরজির প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ কী ইত্যাদি হরেক রকমের প্রশ্ন কিন্তু জটিল প্রশ্নই বটে কিছুটা।
২৬ ধারায় বললো যে, আরজির মাধ্যমে কোনো মোকদ্দমা দায়ের করতে হবে। কিন্তু, আরজি কাকে বলে সে সম্পর্কে কিন্তু কিছুই নেই। তার উত্তর পাওয়া যাবে ‘আরজি’ শিরোনামে খোদ একটি আদেশ, ৭ নং আদেশ থেকে। কিন্তু, কথা আরো আছে। লাফ দিয়ে ৭ নং আদেশে দৌড় দিয়ে যাবারও আগে ৬ নং আদেশ দেখা বাঞ্ছনীয়। তারও আগে ৪ নং আদেশটি তো ২৬ ধারাটির সাথে সরাসরি সম্পর্কিত আদেশ। ফলে সেই ধারাবাহিকতা অনুসারেই আমাদেরকে এগোনো উচিত।
আসুন, তবে ৪ নং আদেশ দেখি। এর মাত্র দুইটি বিধি। এই দুইটি বিধিতেই একদম ঝকঝকা করে বলা আছে কিভাবে আরজি দাখিল করতে হবে। মানে, ২৬ ধারাটিরই এক্সটেনশন হলো ৪ নং আদেশটি। ২৬ ধারার শিরোনাম ও ৪ নং আদেশেরন শিরোনামও হুবহু এক। ছোট্ট আদেশটুকু পুরোটা পড়ে নেই আগে।
আদেশ ০৪ : মামলা দায়ের [Institution of Suit]
১ : মামলা আরজি দাখিলের দ্বারা শুরু হবে [Suit to be commenced by plaint] : ১) আদালত বা তৎকর্তৃক এতদুদ্দেশ্যে নিযুক্ত কর্মকর্তার নিকট আরজি উপস্থাপনের মাধ্যমে প্রত্যেকটি মামলা দায়ের করতে হবে এবং আরজির সাথে যতজন বিবাদী থাকে, ততগুলি আরজির অবিকল নকল অনুরূপ সকল বিবাদীর উপর সমন জারির জন্য দাখিল করতে হবে [Every suit shall be instituted by presenting a plaint to the Court or such officer as it appoints in this behalf a plaint together with as many true copies of the plaint as there are defendants for service of summons upon such defendants] |
ক) মামলার ক্ষেত্রে সমন জারির জন্য প্রদেয় কোর্ট ফি আরজি দাখিলের সময় এবং অন্যান্য কার্যক্রমের বেলায়, যখন পরোয়ানা ব্যবহার করা হয়, তখন পরিশোধ করতে হবে।
খ) প্রত্যেক বিবাদীর জন্য সমনের একটি নকলসহ বিবাদীদের পূর্ণ ও সঠিক ঠিকানাযুক্ত যথোচিত খামে আগাম প্রদত্ত প্রাপ্তি স্বীকার পত্র আরজির সঙ্গে বাদীকে দাখিল করতে হবে ।
২) ৬ষ্ঠ ও ৭ম আদেশে অন্তর্ভুক্ত বিধিমালা যতদূর প্রযোজ্য হয়, তদানুসারে প্রত্যেকটি আরজি প্রণয়ন করতে হবে।
২ : মামলার রেজিস্টার : আদালত প্রত্যেক মামলার বিস্তৃত বিবরণ একটি রেজিস্টারে রাখার উদ্দেশ্যে লিপিবদ্ধ করাবেন এবং উহা দেওয়ানি মামলার রেজিস্টার [Register of Civil Suits] বলে অভিহিত হবে। প্রত্যেক বছর আদালতের আরজি গ্রহণের ক্রমানুসারে লিপিবদ্ধ বিষয়গুলির সংখ্যা দিতে হবে।
এটুকুই ৪ নং আদেশ। পড়লেন মনোযোগ দিয়ে? বুঝলেন? যারা শিক্ষানবিশ হিসেবে কমবেশি যাতায়াত করেছেন আদালতপাড়ায় তাদের কাছে এসব নস্যি বা মামুলি হবার কথা। যার যাননি এখনো তাদের জন্য এটিকে আরেকটু সহজ করে কিছু ছবি দিয়ে দিয়ে পরিষ্কার করে দিতে পারি।
শুরুতেই বাড়তি করে কিছু কথা বলি পুরো পারসেপশনটা ঠিক হবার জন্য। আগের কোনো এক লেকচারে [সম্ভবত ফৌজদারি কার্যবিধির কোনো লেকচারে] বলেছিলাম যে, বিচারক ও বিচারকের অফিসÑ এই দু্ইটি ভিন্ন ধারণা। প্রত্যেকটি বিচারকের অফিস থাকে ভিন্ন ভিন্ন। প্রত্যেক বড় কর্মকর্তা বা অফিসারের, তা সরকারি হোক আর বেসরকারি কর্পোরেট হোক, তাদের দেখবেন শুধু তাকে সাপোর্ট দেওয়ার জন্যই পিয়ন, কেরানি, কম্পিউটার অপারেটর ইত্যাদি নানারকমের কর্মচারী থাকে। তো, একেকজন বিচারক প্রত্যেকেই সরকারি কর্মকর্তা। তারা বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা। এইসমস্ত বিচারকের নিজস্ব অফিস বা চেম্বার থাকে। আরো থাকে তার অধীনে একটি আদালত যেই আদালতে তিনি তার বিচারকাজ করেন। আদালতে পেশকার, পেশকার সহকারী, গার্ড ইত্যাদি থাকে। বিচারকের নিজের চেম্বারে বা খাস কামরায় কম্পিউটার অপারেটর, সহকারী, পিয়ন প্রমুখরা থাকে। এছাড়াও বিচারকের আদালতের নথিপত্র সংরক্ষণ করা হয় আরেকটি অফিসে, যা মূলত সেরেস্তাখানা নামে পরিচিত, যেখানে আরো বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা—কর্মচারী থাকে। প্রত্যেকের ভিন্ন কাজ থাকে। তার মানে বিচারকের নিজের চেম্বার, আদালত বা এজলাস, নথি সংরক্ষণের অফিস- এই সবগুলো মিলে একটি আদালতের একটি পূর্ণাঙ্গ অফিস! উপরের ইমেজটি দেখে বোঝার চেষ্টা করুন।
একটি আরজি লিখে একটি মামলা দায়ের করার সময় একজন আইনজীবী কোথায় যান? সরাসরি বিচারকের চেম্বারে গিয়ে সেটি জমা দেন? নাকি পেশকারের কাছে? এর উত্তর কোনোটিই সঠিক নয়। ৪ আদেশের ১ বিধিতেই লক্ষ করুন, বলা আছে-‘আদালত বা তৎকর্তৃক এতদুদ্দেশ্যে নিযুক্ত কর্মকর্তার নিকট আরজি উপস্থাপনের মাধ্যমে প্রত্যেকটি মামলা দায়ের করতে হবে’।
উপরের ইমেজে সর্ববামে যেই সেরেস্তাদারের অফিস, সেখানে নিযুক্ত সেরেস্তাদারের নিকট জমা দিতে হবে একটি আরজি। কী কী জমা দিতে হবে? কোনো মোকদ্দমায় যতজন বিবাদী থাকে ততজন বিবাদীকে আরজির হুবহু বা অবিকল নকল বা কপি জমা দিতে হবে যেন তা সমন জারিতে বিবাদীদের কাছে পেঁৗছে যায় এবং তারা জানতে পারে যে, তাদের বিরুদ্ধে কোন আরজিতে কি বিষয়ে মামলাটি করা হয়েছে। ক্লিয়ার?
আমরা আরেকটু ক্লিয়ার হতে পারি একটি আরজির কপি এবং সমন সংক্রান্ত চিঠির নমুনা দেখে। আবারো বলি, এই লেকচারটি ভালোভাবে পড়–ন। আরজি, জবাব বা অন্যান্য অংশ বুঝতে আপনার আরো সুবিধা হবে পরবর্তী লেকচারগুলোতে। উপরের অংশ ভালোভাবে না পড়ে বা না বুঝে থাকলে খানিকটা দম নিয়ে পরে আবারো শুরু করুন। কারণ এই লেকচার বোঝার ওপরেই নির্ভর করছে এর পরের লেকচারগুলো কতটা বুঝতে পারবেন।
একটি আরজির প্রথম পৃষ্ঠার উপরের অর্ধেক এর নমুনা দেখুন [পরের পৃষ্ঠায় আছে]।
আরজি, জবাব ইত্যাদি সংক্রান্ত লেকচার পড়ার সময় উক্ত ইমেজের আরো বিস্তারিত বিশ্লেষণ করবো আমরা। এখন শুধু ৪ নং আদেশের বিধিগুলো বোঝার জন্য যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু দেখবো।
প্রথম পৃষ্ঠার নমুনায় দেখতে পাচ্ছেন আরজির কপিতে ওপরে বাম পাশে স্ট্যাম্প বা কোর্ট ফি লাগানো আছে। একেক মামলায় একেক ধরনের কোর্ট ফি থাকে। খোরপোষ আদায়ের উদ্দেশ্যে এই মামলায় ৫০ টাকার কোর্ট ফি লাগানো আছে। এটি আরজি দাখিলের জন্য কোর্ট ফি। আর সমন জারির জন্য [১ বিধির ক উপবিধি লক্ষ করুন] প্রদেয় কোর্ট ফিও জমা দিতে হয়। তার নমুনা দেখুন ৫৫৫ পৃষ্ঠায়।
বিবরণীতে লেখা আছে ‘উপরোক্ত নং মোকদ্দমার … নং বিবাদীকে রেজি. ও সাধারণ সমন জারি বাবদ প্রসেস ফি।’ তারপরে টাকার হিসাব লেখা আছে যে, কোন খাতে কত টাকা। মোট ১৬ টাকার প্রসেস ফি ধায্যর্ হওয়ায় ১৬ টাকার কোর্ট ফি লাগানো আছে সব নিচে। এই কোর্ট ফি জমা দিতে হয় উক্ত বিবাদীগণের প্রতি সমন জারি করার জন্য। এই কোর্ট ফি দেয়ার মাধ্যমেই এই মোকদ্দমার খবর আদালতের কাছ থেকে বিবাদীদের কাছে পেঁৗছায়। তখন বিবাদীরা জানতে পারে যে, তার নামে কোন কোর্টে বা আদালতে কি বিষয়ে মামলা হয়েছে!
তারা কিভাবে মামলার বিস্তারিত বিষয় জানতে পারে? ১ নং বিধির ১ উপবিধিতে অর্থাৎ প্রথম প্যারাতেই লক্ষ করুন, বলা আছেÑ ‘যতজন বিবাদী থাকে, ততগুলি আরজির অবিকল নকল অনুরূপ সকল বিবাদীর উপর সমন জারির জন্য দাখিল করতে হবে’। তার মানে, মামলা দায়ের করার সময় মামলার আরজির কপিও উক্ত সমনের সাথে দিতে হবে, প্রতিটি বিবাদীর জন্য ভিন্ন ভিন্ন কপি দিতে হবে। সমন দেখতে কেমন? কিভাবে যায়? কিভাবে সমন পৌঁছানো হয়? আলোচনা করবো না বিশেষ। অনলাইনে এসব নিয়ে বিস্তারিত ইমেজ দেয়া থাকবে। আর যারা কোর্টে শিক্ষানবিশ হিসেবে নিয়মিত যাওয়া—আসা করেন তাদের জন্য খুবই নস্যি ব্যাপার হবার কথা।
মামলার ক্রমিক নং : আমরা বিভিন্ন মামলায় মামলার নম্বর দেখতে পাই। এই নম্বর দেখেই মামলাকে চেনা যায় বা নির্দিষ্ট করা হয়। এই নম্বর বা ক্রমিক কোথা থেকে আসে? এই নম্বর আসে যখন আদালতে একটি মামলা দায়ের করার জন্য নিযুক্ত কর্মকর্তার কাছে আরজিটি জমা দেওয়া হয়, তখন। ৪ আদেশের ২ নং উপবিধিতে দেখেন বলা আছে- আরজি গ্রহণের ক্রমানুসারে একটি সংখ্যা দিতে হবে। একারণেই কোনো মামলার নম্বর ১ থেকে শুরু হয়ে যেকোনো সংখ্যা হতে পারে, যতোগুলো মামলা উক্ত বছরে হবে সেই অনুযায়ী। আগের পৃষ্ঠার সমনের কোর্ট ফি’র ইমেজে থাকা মোকদ্দমাটির নম্বর ছিলো- ২২৯/২০১৫ অ.প্র.। তার মানে উক্ত ২০১৫ সালে এই মামলাটি দায়ের করার আগে আরো ২২৮টি মামলা দায়ের করা হয়েছে উক্ত নির্দিষ্ট আদালতে। এই মামলা দায়ের হবার পরে আরো যতো মামলা আসবে সেই হিসেবে ২৩০/২০১৫, ২৩১/২০১৫ এভাবে নম্বরগুলো বসতে থাকবে। এবং এটি দেওয়ানি আদালতের রেজিস্টার খাতায় লিপিবদ্ধ করতে হবে। ক্লিয়ার?
মামলা দায়ের সম্পর্কে আর কোনো বিস্তারিত আলোচনার নাই।