সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের পরিচয় ও প্রকৃতি [ধারা 1-7]
ম্যাপিং : সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন মূলত একটি তত্ত্বগত আইন। বিশেষত দেওয়ানি কার্যবিধির প্রধান তত্ত্বগত বা দেওয়ানি বিরোধ সংক্রান্ত প্রধান বিষয়গুলো এখানে বর্ণিত আছে। সে কারণেই দেওয়ানি কার্যবিধির আগেই সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনটি পড়ে নেওয়া ভালো। এটি সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের প্রথম লেকচার বিধায় এটি গুরুত্ব সহকারে পড়তে হবে অবশ্যই। এ লেকচারে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ ধারা হচ্ছে ৫। সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন সর্ম্পকে প্রাথমিক ধারণাগুলো নিয়ে পরীক্ষায় খুব বেশি এমসিকিউ আসেনি বিগত সালগুলোতে, তবে অনেক প্রশ্ন এখান থেকে আসা সম্ভব। সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের প্রথমিক বিষয়গুলো এই লেকচারে আছে। সরাসরি মূল আলোচনায় চলে যাই।
মূল আলোচনা
আমরা শুরুতেই আইনের প্রস্তাবনার অংশটি পড়ি।
“সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন-১৮৭৭
(১৮৭৭ সালের ১ নং আইন)
প্রস্তাবনা
যেহেতু দেওয়ানি মোকদ্দমাসমূহে অর্জনযোগ্য কতিপয় সুনির্দিষ্ট প্রতিকার বিষয়ক আইনের ব্যাখ্যা ও সংশোধন যুক্তিযুক্ত ও প্রয়োজন, সেহেতু এতদ্বারা নিম্নরূপ আইনটি প্রণয়ন করা হল।
এই প্রস্তাবনা থেকেই বেশ কিছু বিষয় পরিষ্কার হয়ে যায়। সাধারণত একটি আইনের প্রস্তাবনা সেই আইনটির উদ্দেশ্য, প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তা এবং কোন প্রেক্ষাপটে প্রণীত হয়েছে সেই বিষয়গুলো বলা থাকে। সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের প্রস্তাবনাও এর ভিন্ন কিছু না।
উক্ত প্রস্তাবনা থেকে কিছু কী ওয়ার্ড নিয়ে আমরা নিচে আলোচনা করবো। যা প্রস্তাবনাটিকে বোঝার জন্য সহজ একটি প্রক্রিয়া এবং একইসাথে এই আইনটি পড়ার জন্য সুবিধাজনকও হবে।”
দেওয়ানি মোকদ্দমা : প্রস্তাবনাতেই স্পষ্টভাবে বলে দেওয়া আছে আইনটি দেওয়ানি বিষয়সমূহের ক্ষেত্রেই কার্যকর হবে। অর্থাৎ ফৌজদারি কোনো বিষয়ে সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন কোনো প্রতিকার দেয় না।
অর্জনযোগ্য সুনির্দিষ্ট প্রতিকার : একথাটি বোঝার জন্য আমাদের একটু চোখ ফেরাতে হবে আইনের ইতিহাসের দিকে। ইংল্যান্ডের প্রাচীন আইন ব্যবস্থায় দুই ধরনের আইন ছিলো।
১. সাধারণ আইন [Common Law]
২. ন্যায় পরায়নতা আইন [Equity Law]
এই দুই ধরনের আইনের মধ্যে সম্পর্ক ছিলো এমন যে, সাধারণ আইনের অসামঞ্জস্যতা বা অসম্পূর্ণতাকে পূরণের ক্ষেত্রে ন্যায়পরায়নতার আইন ব্যবহার করা হত। যদি এমন কোনো সমস্যার উদ্ভব হতো যার কোনো সমাধান সাধারণ আইনে নেই বা থাকলেও যে সমাধান আছে তা পূর্ণাঙ্গ না, সেক্ষেত্রে ন্যায়পরায়নতা আইন অনুযায়ী সেই সমস্যার যথাযথ সমাধান করা হতো। সেই ন্যায়পরায়নতার আইনের প্রয়োগে যেসকল ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট প্রতিকার অর্জন করা সম্ভব সেসকল ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট প্রতিকার প্রদান করাই হচ্ছে সুনির্দিষ্ট অর্জনযোগ্য প্রতিকার।
এছাড়াও, বর্তমান পরিস্থিতিতে দেওয়ানি কার্যবিধি এবং চুক্তি আইনে যেসকল প্রতিকার প্রদান করা হয়েছে সে সকল প্রতিকার ব্যতীত অন্য কোনো সুনির্দিষ্ট প্রতিকার, যা অর্জনযোগ্য, এমন প্রতিকার প্রদানের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন কার্যকর হয়। সেদিক থেকে দেওয়ানি কার্যবিধি এবং চুক্তি আইনের মধ্যবর্তী একটি অবস্থা হিসেবে সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনকে দেখা যেতে পারে।
সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন কী, এ বিষয়ে বাস্তবিকপক্ষে আরো বিশদ আলোচনার দরকার। সে বিষয়ে আমরা পরে আরো বিস্তারিত আলোচনা করবো।
সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের সাধারণ বিষয় হিসেবে নিচের কয়েকটি তথ্য মনে রাখা বাঞ্ছনীয়।
১. এই আইনটি কার্যকর হয় ১৮৭৭ সালের ১ মে থেকে।
২. সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন ১৮৭৭ সালের ১ম আইন।
৩. সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনটি মূলত তত্ত্বগত আইন।
৪. আইনটিতে ৫৭টি ধারা আছে। ৩টি খণ্ডে এটি বিভক্ত।
এবার এর মূল ধারাগুলো একে একে পড়তে থাকি।
“ধারা ১ : সংক্ষিপ্ত শিরোনাম : এই আইন সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন, ১৮৭৭ নামে অভিহিত।
স্থানীয় বিস্তার : ইহা সমগ্র বাংলাদেশে প্রযোজ্য হবে।
বলবৎ হবার সময় : ১৮৭৭ সালের মে মাসের ১লা তারিখ হতে এই আইন বলবৎ হবে।”
ধারা ২ : বাতিল
“ধারা ৩ : ব্যাখ্যা অনুচ্ছেদ [Interpretation-clause] : এই আইনে যদি না প্রসঙ্গ অথবা বিষয়বস্তুতে বিপরীত কোনো কিছু থাকে তবে –
বাধ্যবাধকতা বলিতে আইন দ্বারা কার্যকরীকরণযোগ্য প্রতিটি কর্তব্যকে বুঝাইবে [“obligation” includes every duty enforceable by law]।
‘জিম্মা’ বলিতে প্রত্যক প্রকারের সুস্পষ্ট ইঙ্গিতবোধক অথবা আনুমানিক বিশ্বাসপূর্বক ন্যস্ত মালিকানাকে বুঝায় [“trust” includes every species of express, implied, or constructive fiduciary ownership]।
‘জিম্মাদার’ বলিতে এমন প্রতিটি ব্যক্তিকে বুঝায় যে, সুস্পষ্টভাবে, ইঙ্গিতবোধভাবে অথবা আনুমানিকভাবে বিশ্বাসপূর্বক ন্যস্ত মালিকানার অধিকারী [“trustee” includes every person holding, expressly, by implication, or constructively, a fiduciary character;
উদাহরণ : (ক) খ জমি দান করে ক-কে এবং ‘এতে কোনোরূপ সন্দেহ রাখে নাই যে, খ জীবিত থাকা পর্যন্ত ক তাহাকে বাৎসরিক ১০০০.০০০ টাকা বৃত্তি দিবে’। ক এই দান গ্রহণ করল। এই ক্ষেত্রে ক এই আইনের অর্থ অনুসারে বার্ষিক বৃত্তির সীমা পর্যন্ত খ-এর জিম্মাদার।
(খ) ‘ক’-‘খ’-এর আইনগত, চিকিৎসাগত অথবা আধ্যাত্মিক উপদেষ্টা। এই উপদেষ্টা তাদের সদ্ব্যবহার করে ‘ক’ কিছু আর্থিক সুবিধা অর্জন করে যা অন্যভাবে ‘খ’-এর নিকট জমা হতে পারত। এই আইনের অর্থানুসারে উক্ত সুবিধার ব্যাপারে ‘ক’ ‘খ’ এর জিম্মাদার।
(গ) ‘ক’ ‘খ’- এর ব্যাংকার হিসেবে তার নিজস্ব উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য ‘খ’- এর হিসাবের অবস্থা ফাঁস করে দেয়। এই আইনের অর্থানুসারে তেমন ফাঁসের ফলে ‘ক’ যে সুবিধা লাভ করেছে সেইটুকুর জন্য ‘ক’ ‘খ’-এর জিম্মাদার।
(ঘ) ‘ক’ কতিপয় ইজারাধীন সম্পত্তির বন্ধকগ্রহীতা হিসেবে নিজের নামে ইজারার মেয়াদ বৃদ্ধি করে নেয়। এই আইনের অর্থানুসারে মূল ইজারার সহিত স্বার্থ সংশ্লিষ্টদের জন্য ‘ক’ হইতেছে নবায়িত ইজারার জিম্মাদার।
(ঙ) অংশীদারদের একজন হিসেবে ‘ক’- কে কারবারের মালামাল ক্রয়ের জন্য নিযুক্তি করা হয়েছে। ‘ক’ তার অন্যান্য অংশীদাদের অজ্ঞাতে বাজারদরে এমন মাল সরবরাহ করে যা সে বাজার দর যখন কম ছিলো তখন ক্রয় করেছিল এবং এইভাবে সে উল্লেখযোগ্য মুনাফা অর্জন করে। এই আইনের অর্থানুসারে তেমনভাবে অর্জিত মুনাফার ব্যাপারে অন্যান্য অংশীদারদের জন্য ‘ক’ একজন জিম্মাদার।
(চ) ‘খ’-এর মালিকানাধীন নীল কারখানার ম্যানেজার ‘ক’ নীল বীজ বিক্রেতা ‘গ’-এর এজেন্ট হয় এবং ‘খ’- এর সম্মতি ছাড়াই কারখানার জন্য ‘গ’ এর নিকট হতে খরিদ করা নীল বীজের উপর কমিশন গ্রহণ করে। এই আইনের অর্থানুসারে উক্তরূপে গৃহীত কমিশনের ব্যাপারে ‘ক’ ‘খ’-এর জিম্মাদার।
(ছ) ‘খ’ ইতোপূর্বেই যে জমি ক্রয়ের জন্য চুক্তিবন্ধ হয়েছে একথা জেনেও ‘ক’ ঐ জমি ক্রয় করে। এই আইনের অর্থানুসারে উক্তরূপে ক্রয় করা জমির ব্যাপারে ‘ক’ হতেছে ‘খ’-এর জিম্মাদার।
(জ) ‘গ’ জমি দখল করে আছে একথা জেনেও ‘ক’ ‘খ’-এর নিকট হতে জমি ক্রয় করিল। ‘ক’ উক্ত জমির ব্যপারে ‘গ’ এর স্বত্ব সম্পর্কে কোনো তদন্ত করিবার ব্যাপারটি উপেক্ষা করে। এই আইনের অর্থানুসারে তেমন স্বত্বের সীমা পর্যন্ত ‘ক’ ‘গ’-এর জিম্মাদার।
‘পত্তনী’ অর্থ এমন দলিল [১৯২৫ সালের উত্তরাধিকার আইন (১৯২৫ সনের ৩৯ নং আইন) বর্ণিত সংজ্ঞানুসারে যা উইল বা উইলের পরিশিষ্ট নহে] যার দ্বারা স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তিতে আনুষঙ্গিক স্বত্বের প্রতিসংক্রম বা লক্ষ্যের প্রবর্তন করা হয় অথবা প্রবর্তন করবার সম্মতি প্রকাশ করা হয়।
চুক্তি আইনে বর্ণিত শব্দের সংজ্ঞা : ১৮৭২ সালের চুক্তি আইনে সংজ্ঞা প্রদান করা হয়েছে, এমন যেসব শব্দ আইনে ব্যবহৃত হয়েছে তার অর্থ উক্ত আইনে অনুরূপ শব্দগুলির যে অর্থ করা হয়েছে, সেই একই অর্থবোধক বলিয়া গণ্য করতে হবে।”
ধারাটির শিরোনামে ‘ব্যাখ্যা অনুচ্ছেদ’ কথাটি বলা হলেও ধারাটিতে মূলত মাত্র তিনটি শব্দের সংজ্ঞা প্রদান করা হয়েছে। শব্দ তিনটি হলো- বাধ্যবাধকতা, জিম্মা এবং জিম্মাদার। এগুলো সম্পর্কে সাধারণ ধারণা রাখা প্রয়োজন।
বাধ্যবাধকতা : এই আইনে বাধ্যবাধকতা বলতে, আইন দ্বারা কার্যকরীকরণযোগ্য প্রতিটি কর্তব্যকে বোঝাবে। আইন শব্দ-কোষ বইয়ে, Obligation বা বাধ্যবাধকতা বলতে বুঝিয়েছে, একটি আইনি কর্তব্য বা দায়। দ্বায়িত্ব বা বাধ্যবাধকতা নানা প্রকারের হতে পারে বা আইন হতে উদ্ভুত হতে পারে। অক্সফোর্ড ডিকশনারি অনুযায়ী Obligation বা বাধ্যবাধকতা বলতে বুঝায়-
An act or course of action to which a person is morally or legally bound, a duty or commitment.
সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনে বাধ্যবাধকতা বলতে বোঝাবে মূলত এমন কোনো কাজ যা করার জন্য কেউ আইন দ্বারা বাধ্য। একটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। যেমন, ‘ক’ ‘খ’ এর একটি বাড়ি থাকার জন্য ভাড়া নেয়। ‘ক’ ‘খ’ এর সাথে যত টাকা ভাড়া বাবদ চুক্তি করেছে তত টাকা ‘খ’ কে প্রদান করতে ‘ক’ আইনগত বাধ্য।
জিম্মা : ‘জিম্মা’ বলতে প্রত্যেক প্রকারের সুস্পষ্ট ইঙ্গিতবোধক অথবা আনুমানিক বিশ্বাসপূর্বক ন্যস্ত মালিকানাকে বুঝায়। এখানে তিনটি বিষয়কে স্পষ্ট করা হয়েছে। প্রথমত, সুস্পষ্টভাবে ন্যস্ত মালিকানা, দ্বিতীয়ত, ইঙ্গিতবোধক ন্যস্ত মালিকানা অর্থাৎ কোনো একজনকে ইঙ্গিত প্রদান করে সৃষ্ট জিম্মা এবং তৃতীয়ত, আনুমানিকভাবে বিশ্বাসপূর্বক ন্যস্ত মালিকানা অর্থাৎ কোনো একটি জিম্মার জিম্মাকারী ব্যক্তির পূর্ব বিশ্বাস এর অনুমানে সে জিম্মা করা হয়। অর্থাৎ জিম্মা বা অছি শব্দটি প্রকাশ্য অথবা উহ্যভাবে হোক তা কোনো একটা আস্থাভাজন চরিত্রের ধারণাকে অন্তর্ভুক্ত করে।
জিম্মাদার : ‘জিম্মাদার’ বলতে এমন প্রতিটি ব্যক্তি অন্তর্ভুক্ত হবে যে সুস্পষ্টভাবে, ইঙ্গিতবোধকভাবে অথবা আনুমানিকভাবে বিশ্বাসপূর্বক ন্যস্ত মালিকানার অধিকারী।’
আমরা একটু আগে জিম্মার সংজ্ঞা দেখেছি। সহজ ভাষায় কোনো জিম্মা যার উপরে বর্তায় সেই জিম্মাদার, অর্থাৎ জিম্মা যাকে দেওয়া হয় বা যে পায় সেই জিম্মাদার। ধারাটির সাথেই জিম্মা এবং জিম্মাদার নিয়ে ৮টি উদাহরণ দেওয়া আছে। সেগুলো একটু দেখে নিলে আরো স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে। নিচে ৪ ধারাটি পড়ুন এবার।
“ধারা ৪ : সংরক্ষণ : যদি না এই আইনের কোথাও অন্যরূপে সুস্পষ্টভাবে বিধিবদ্ধ থাকে, তবে এই আইনের কোনো কিছুকেই এই রূপ গণ্য করা হবে না যাতে-
(ক) চুক্তি নহে এমন কোনো অঙ্গীকারের ব্যাপারে প্রতিকারের কোনো অধিকার প্রদান করা হয় ;
(খ) কোনো ব্যক্তিকে কোনো প্রতিকারের অধিকার হতে বঞ্চিত করা হয়, শুধু সুনির্দিষ্ট কার্য সম্পাদন ছাড়া, যাতে কোনো চুক্তির অধীন পেতে পারত; অথবা
(গ) দলিলসমূহের উপর ১৯০৮ সালের রেজিস্ট্রেশন আইনের প্রয়োগকে প্রভাবিত করা হয়।”
এই ধারাটিতে দেখুন, তিনটি বিষয়ে বলা হয়েছে।
১. চুক্তি না এমন কোনো অঙ্গিকারের ব্যাপারে কোনো প্রতিকার দেওয়া হবে না।
২. কোনো চুক্তির মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি যে অধিকার পেতে পারতো তাকে সেই অধিকার থেকে বঞ্চিত না করা [সুনির্দিষ্ট কার্য সম্পাদন বাদে]।
৩. দলিলের ক্ষেত্রে রেজিস্ট্রেশন আইনের প্রয়োগ প্রভাবিত হবে না সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনটি দ্বারা।
এবার অতি গুরুত্বপূর্ণ ধারা ৫।
“ধারা ৫ : সুনির্দিষ্ট প্রতিকার কিভাবে দেওয়া হয় : সুনির্দিষ্ট প্রতিকার প্রদান করা হয়-
ক. কোনো নির্দিষ্ট সম্পত্তির অধিকার গ্রহণ এবং তাহা দাবিদারকে অর্পণের মাধ্যমে;
খ. কোনো কাজ করতে আইনগতভাবে বাধ্য এমন পক্ষকে ঐ কাজ করিবার আদেশ প্রদানের মাধ্যমে;
গ. আইনগতভাবে কোনো কাজ না করতে বাধ্য এমন পক্ষকে তাহা করা হতে বিরত রাখিবার মাধ্যমে;
ঘ. ক্ষতিপূরণের রায় ব্যতীত পক্ষসমূহের অধিকার নির্ণয় এবং ঘোষণার মাধ্যমে; অথবা
ঙ. রিসিভার নিয়োগের মাধ্যমে।”
এ ধারাতেই মূলত সুনির্দিষ্ট প্রতিকারসমূহের কথা বলা হয়েছে। এখানে ৫ ধরনের প্রতিকারের উল্লেখ আছে। ৫ ধারা অনুযায়ী সুনির্দিষ্ট প্রতিকার সমূহকে আরেকটু ইলাবোরেট করা যেতে পারে।
প্রথমত, কোনো সম্পত্তির দখল গ্রহণ এবং দাবিদারকে অর্পণ। উদাহরণ দিয়ে বুঝি। ধরা যাক, লাবিব একটি বাড়ির স্বত্ব দাবিদার। কিন্তু সেই বাড়ির দখল গ্রহণ করে আছে মিলন। অগত্যা লাবিব আদালতের শরণাপন্ন হয় এবং আদালতের কাছে প্রমাণ করতে সক্ষম হয় যে বাড়িটির স্বত্ব তার। এক্ষেত্রে আদালত প্রথমে, মিলনের নিকট থেকে বাড়িটির দখল গ্রহণ করবে এবং তা লাবিবের নিকট অর্পণ করবে। এভাবে সুনির্দিষ্ট প্রতিকার দেওয়া যায়।
দ্বিতীয়ত, কোনো পক্ষ যা করতে বাধ্য তা করতে বাধ্য করার মাধ্যমে। আমরা আগেই বলেছি আইনগতভাবে কোনো কিছু করতে বাধ্য হওয়াকেই বাধ্যবাধকতা বলে। ধরা যাক, মিলন, লাবিবের একটি বাড়িতে থাকার উদ্দেশ্যে ভাড়া নেয়। বাড়ি ভাড়ার চুক্তিতে মিলন ভাড়া বাবদ ৪০০০ টাকা প্রদান করতে সম্মত হয়। এখন মিলন আইনগতভাবে বাধ্য লাবিবকে সেই টাকা প্রদানে। তাকে সেই টাকা প্রদান করতে বাধ্য করাটি সুনির্দিষ্ট প্রতিকার পাবার আরেকটি মাধ্যম। এটিই ৫ ধারার খ উপধারায় বলা হয়েছে।
তৃতীয়ত, কোনো পক্ষ আইনগতভাবে যা না করার জন্য বাধ্য তাকে সেই কাজ থেকে বিরত রাখা। ৬ ধারাতেও মূলত এ বিষয়েই বলা আছে। সাধারণভাবে অন্যের জমির উপরে নিজের স্থাপনা তৈরী করা বেআইনি। অর্থাৎ অন্যের জমিতে নিজের স্থাপনা তৈরী না করতে আমরা আইনগতভাবে বাধ্য। এমন কাজ থেকে বিরত রাখার ব্যপারে এই সুনির্দিষ্ট প্রতিকার মঞ্জুর করা হয়। এটিই ৫ এর গ উপধারার মূল কথা।
চতুর্থত, ঘোষণামূলক ডিক্রি বা আইনগত অধিকার ঘোষণার মাধ্যমে। দলিল সংশোধন, চুক্তি বাতিল, দলিল ঘোষণা বা বাতিলের মাধ্যমে এই ধরনের প্রতিকার দেওয়া যায়। এটিই ঘ উপধারার মূল কথা। সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ধারা ৩১ থেকে ৪২ পর্যন্ত এ বিষয়ে বিস্তারিত বোঝা যাবে।
পঞ্চমত, রিসিভার নিয়োগের মাধ্যমে। অর্থাৎ কোনো বিবাদমান সম্পত্তিতে বিবাদ নিষ্পত্তি হওয়া পর্যন্ত সেই সম্পত্তির সুষ্ঠু দেখভাল এবং সংরক্ষণের জন্য তৃতীয় কোনো পক্ষকে দ্বায়িত্ব প্রদানের মাধ্যমে সুনির্দিষ্ট প্রতিকার দেওয়া যেতে পারে। এটিই ঙ উপধারার মূল কথা।
এতো গেলো ৫ ধারার পরিচিতি। আর ধারা ৬ এ বলা হচ্ছে নিরোধক প্রতিকারের কথা। এই ধারায় ৫ ধারারই গ উপধারার ফল্লেখে বলা আছে নিরোধক প্রতিকারের সংজ্ঞা। আর কিছু নয়। অন্যদিকে ৭ ধারায় বলা আছে- শুধু দণ্ডমূলক আইন কার্যকর করার উদ্দেশ্যে সুনির্দিষ্ট প্রতিকার মঞ্জুর করা হয় না। অর্থাৎ ফৌজদারি কোনো আইন কার্যকর এর ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট প্রতিকার হয় না। তবে প্রতিকারপ্রার্থীর অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য বা দেওয়ানি প্রতিকার প্রদানের জন্য যদি কোনো দণ্ডমূলক আদেশ দিতে হয় তবে তা দিতে কোনো বাধা নেই। ৬ ও ৭ ধারাটি দেখুন।
“ধারা ৬ : নিরোধক প্রতিকার : ৫ ধারা গ) দফার অধীন মঞ্জুরীকৃত সুনির্দিষ্ট প্রতিকারকে নিরোধক প্রতিকার বলা হয়।”
“ধারা ৭ : দণ্ডমূলক আইন কার্যকর করিবার জন্য প্রতিকার মঞ্জুর করা হয় না : শুধু দণ্ডমূলক আইন কার্যকর করিবার উদ্দেশ্যে সুনির্দিষ্ট প্রতিকার মঞ্জুর করা হয় না।”